কলাম

~~ছাত্ররাজনীতিঃ নিষিদ্ধকরণ বনাম সংস্কার~~ 

‘ছাত্ররাজনীতি’ বা ‘স্টুডেন্ট পলিটিক্স’-এর প্রসঙ্গ উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে পড়া উনিশশো বায়ান্ন সালে সংগঠিত ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী সেইসকল বীর শহীদদের কথা ।সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউলদের মতো একদিকে মেধাবী ও আদর্শবাদী এবং অন্যদিকে সুস্থধারার ছাত্ররাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ছাত্রনেতাদের জীবন বাজি রেখে মায়ের‌ ভাষার সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সম্মিলিত অবদানের কথা কখনোই ভুলে যাওয়ার নয় ।কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান ছাত্ররাজনীতির যে নাজুক পরিস্থিতি- তা দেখলে বারবার এদেশে উনিশশো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাকে অত্যন্ত‌ দুঃখের সাথে স্মরণ করতে হয় ।আমরা কেউইতো এমন স্বার্থবাদী ও আদর্শহীন ছাত্ররাজনীতি চাইনি ! 
বর্তমানে পাবলিক‌ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বরাবরের মতো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রবল দাপট পরিলক্ষিত হয় ।এগুলোতে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে হলে সিট পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের খুশি রাখতে হয় ।নিতান্তই ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসভিত্তিক‌ ছাত্ররাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে হয় ।এমনকি সিনিয়রদের নানাধরনের শাস্তি(!) থেকে রেহাই পেতে অনেকসময় গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস রেখে মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দিতে হয় ।এছাড়াও বিভিন্নধরণের নিয়োগবাণিজ্য, চাঁদাবাজি,‌ টেন্ডারবাজি,‌ প্রশ্নপত্রফাঁস এবং সুযোগ পেলেই পেশীশক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার যেন কোনো বিষয়ই নয় ।আর বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষকদের উপর হামলাও আজকাল অহরহ খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাওয়া যায় ।ক্যাম্পাসগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে কত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী যে অকালে জীবন দিয়েছে তার হিসেব কে রাখে? মোটকথা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন অবস্থাকে প্রত্যক্ষ করে অনেকেরই মতামত- একেবারে আইন করে ছাত্ররাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া ।কিন্তু এধরণের উদ্যোগ নিলে বিষয়টি হবে এমন- পা ব্যথা করছে আর সাথে সাথে পা কেটে ফেলা, পা-কে দেহ থেকে একদম বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া । 
একথা না বললেই নয়, এই‌ বসুন্ধরায় প্রত্যেকটি বিষয় ও বস্তুরই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিকই আছে । 
‘ছাত্ররাজনীতি’কে নিষিদ্ধ না করে বরং সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে একে নতুনত্বের সাথে সংস্কারের ।এজন্যে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্রসংসদ’ প্রতিষ্ঠা করার কার্যকরী উদ্যোগ নিতে‌ হবে যেন সকল শিক্ষার্থী লাভবান হয় ।ক্যাম্পাসে ছাত্রনেতাদের দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য হবে- বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সময়মতো ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছেন কিনা- নজর রাখা, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা- পর্যবেক্ষণ করা এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্নরকম খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুব্যবস্থা অব্যাহত রাখা প্রভৃতি । 
দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষকসমাজ যদি নীতি-নৈতিকতা চর্চাকে আরও গুরুত্ববহ করে শিক্ষার্থীদের সামনে একেকজন রোল মডেল হিসেবে দাঁড়াতে পারেন- তাহলে বর্তমান ছাত্ররাজনীতি থেকে সুফল বয়ে আনা সময়ের ব্যাপার ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবিতা